দেশ প্রেম বা স্বদেশ প্রেম

দেশ প্রেম বা স্বদেশ প্রেম

“স্বদেশের উপকারে নাহি যার মন

কে বলে মানুষ তারে পশু সেই জন?” 

দেশ প্রেম
দেশ প্রেম

ডঃ মোঃ শহিদুল্লাহ বলেছেন  মাতৃ, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা আমাদের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান।  নির্দেশের আলো, বাতাস, মাটি, প্রকৃতি ও জলবায়ু, ফলমূল সর্বোপরি এর মধুর পরিবেশে সঙ্গে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক। দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধকেই দেশ প্রেম বলে। প্রতিটি মানুষের নিকটেই তার স্বদেশ অত্যন্ত প্রিয় ও মাতৃ তুল্য।  তাই কবি কণ্ঠে উচ্চারিত হয়-

 “জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপি গরীয়সী।’’

স্বদেশকে ভালোবাসা মানুষের একটি জন্মগত প্রবৃত্তি।  সব সময় আমরা এর সম্পর্কে সচেতন থাকি না; তার হৃদয়ের মধ্যে সুপ্ত থাকে। স্বদেশের কোন অপমানে বা স্বদেশবাসীর দুঃখ-দসহসা এ অনুভূতি জেগে ওঠে।

দায়িত্ব ও কর্তব্য

দেশ প্রেম
দেশ প্রেম

দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ও হৃদয়ের টান মানুষের একটি সঞ্চয়জাত প্রবৃত্তি ও মৌলিক অনুভূতি।  পিতা-মাতা, ভাইবোন ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি যে ভালোবাসা, মমত্ববোধ আপনা আপনি গড়ে ওঠে তদ্রুপ স্বদেশের প্রতি তার ভালোবাসা ও মমত্ববোধ এমনিতেই গড়ে ওঠে অর্থাৎ স্বদেশের প্রতি মানুষের ভালোবাসা স্বাভাবিক ও  স্বতস্ফর্ত ভাবেই জন্মে। দেশের প্রতি ভালোবাসা কেবল অন্তরে লালন করাই যথেষ্ট নয় বরং প্রতিটি কর্মে দেশে কল্যাণ সাধনের প্রকাশ ঘটানো একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

উৎস ও ত্যাগ

দেশ প্রেম
দেশ প্রেম

উৎস ও ত্যাগঃ  আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন,হুব্বুল ওয়া তালে নেসফুল ঈমান অথ্যাৎদেশপ্রেম ঈমানের একটি অঙ্গ। দেশের মঙ্গলের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও কেউ দ্বিধাবোধ করে না। তাইতো আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য উৎসর্গ করতে হয়েছে। অনেক রক্ত ত্যাগ ও অসংখ্য জীবন। আর এ দেশ মাতৃকার জন্য কবি মাইকেল মধুসূদন যথার্থই বলেছেন-

 “বহু দেশ দেখিয়াছি বহুৎ দলে 

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটেকার জলে?

 দুগ্ধশ্রুত রুপি তুমি জন্মভূমি  স্তনে।’’

 পশু পক্ষীর ও দেশপ্রেম আছে কিন্তু মানুষের দেশপ্রেম একটি গভীরতর কারণ থেকে উদ্ভূত হয় এবং তা একটি উচ্চতর আদর্শের অনুসরণ করে। পশু পক্ষী আপন বাসস্থানকে অতি প্রিয় বলে মনে করে। তাদের অনুভূতিটি সংসর্গজাত। বনের পশুকে বন থেকে ধরে লোকালয়ে আনলে সে যে একটি মর্মান্তিক অশান্তি অনুভব করে তা আমরা লক্ষ্য করেছি। পশুদের সাথে মানুষের অনুভূতিটি অসাধারণ। মানুষের দেশপ্রেম শুধু সংসর্গ জাত নয় তা জন্ম জন্মান্তরে বংশানুক্রমিক ধারায় একটি বিশেষ রীতিনীতি, শিক্ষা দীক্ষা ও সভ্যতার সমবায় থেকে সৃষ্টি হয়। যে দেশের জন্ম গ্রহণ করি সে দেশের ইতিহাস অজ্ঞাতসারে আমাদের হৃদয়কে আকৃষ্ট করে। সে দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি একটি শ্রদ্ধা প্রীতি ও গ্রুপের অনুভূতি হৃদয়কে আসন্ন করে থাকে। তা বাইরের সংসর্গ নয়, তা আত্মার নিবিড় চৈতন্যবোধ। এর বোধটুকু জগতে বিভিন্ন ইতিহাসের সৃষ্টি করেছে। এটাই দেশপ্রেম বা স্বদেশ প্রেম। 

ইংরেজি Patriotism বলতে যা বুঝায় প্রাচীন ও মধ্য যুগেও আমাদের দেশে সে সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না।  ট্রয়ের যুদ্ধ জাতীয় কিছু এখানে সংঘটিত হয়নি। শুধু জঙ্গল বাড়ির ফিরোজ শাহের কাহিনীতে কিছু শিখার উক্তি মেলে নবাব স্ত্রী সকিনার চরিত্রে। সেখানে স্বদেশপ্রেমে সখিনার প্রতি প্রেমী মূর্খ। প্রকৃতপক্ষে ১৯ শতকে এদেশে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবের ফলে ইংরেজি শিক্ষিত বাঙ্গালীদের মনে এই যে  Patriotismবা স্বদেশপ্রেমের বীজ  উপ্ত হয়েছিল। তার সৃষ্ট কাব্য মেঘনাদবধের রাবন চরিত্রে এই স্বদেশপ্রেমের বিকাশ ঘটেছিলেন।

বিগত ১৯৭১ সালে স্বদেশ ভূমিকে মুক্ত করার জন্য এদেশের হাজার হাজার তরুণ দেশপ্রেমের অগ্নি মন্ত্রের দীক্ষিত হয়ে গেরিলা যুদ্ধে  ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অকাতরে শত শত যুবক প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল।  স্বদেশের মাটি ও মানুষের জন্য গভীর মমতা না থাকলে সেটা কখনোই সম্ভব হতো না। এ দেশপ্রেমের প্রকাশ আমরা অনুভব করি বিদেশ থেকে স্বদেশে ফিরবার সময়। দীর্ঘ প্রবেশের পর স্বদেশের স্নেহশীতল খুঁটির কারি কথা মনে পড়লে চিত্রের উল্লাস আপনার  থেকেই বের হয়ে আসে। স্বদেশের এ অনুভূতিটি যার নেই তার আত্মা পাষাণ; তাকে মানুষ বললে মানুষ নামটা কলঙ্কিত হয়।  এ দেশপ্রেমের স্পষ্টতার অনুভূতি জাগে স্বদেশের স্বাধীনতা ও সম্মান রক্ষা করার সময়। জীবন অপেক্ষা প্রিয় বস্তু আর কি হতে পারে?  এই প্রিয় বস্তু তুচ্ছ হয়ে যায় দেশপ্রেমের নিকট। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকগণ স্বদেশের জন্য অনাহার, অনিদ্রা কি অগ্রাহ্য করে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাসিমুখে মৃত্যুবরণ করে।

দেশ প্রেম
দেশ প্রেম

 সুতরাং দেখা যায় দেশ প্রেম সকল মুহূর্তের উৎস, মনুষ্যত্বের প্রসূতি। আপনার প্রিয় বস্তুগুলো পরিত্যাগ করে মানুষ মোহ থেকে মুক্ত হয়।  স্বার্থ থেকে অনেক ঊর্ধ্বে উঠে যায়।  তার জীবনের সব জরতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।  সাথে সাথে তার  যশঃ গৌরব চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে তার নাম অক্ষয় হয়ে বিরাজ করে।  স্বদেশের গ্রুপে তার হৃদয় ভরপুর হয়ে উঠে, দেশ প্রেম কোন খালি ব্যর্থ হয় না।  কেবল যে যুদ্ধক্ষেত্রেই এদেশ প্রেমের পূরণ হয় তা নয়, শান্তির সময়ও সমভাবে স্বদেশ সেবা করবার অনেক অবকাশ আছে। শিল্পকলা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কাব্য ,সাহিত্য, স্বাস্থ্য ও শ্রীর উন্নতি বিধান কি দেশপ্রেম নয়? এর জন্য যথেষ্ট স্বাদ থেকে প্রয়োজন হয়। আজীবন প্রাণপাত সাধনা করতে হয়। 

এসব জনহিত কর্মের দ্বারা স্বদেশের গৌরব বৃদ্ধি পায়, দেশের ইতিহাসকে উজ্জ্বল করে তোলা যায়।  দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় পল্লীতে পল্লীতে কত খ্যাতনামা যুবক গ্রামের শ্রীবৃদ্ধির জন্য প্রতিনিয়তই কর্মময় রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।

দেশপ্রেম অপেক্ষা মানব প্রেম আরও উচ্চতর। দেশপ্রেম মানব প্রেম লাভের সোপানস্বরূপ। যে মহাত্মার দেশপ্রেম উচ্ছ্বাসিত হয়ে দেশের ভৌগলিক সীমা ছাড়িয়ে পৃথিবীময়  ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে, তিনি ধন্য। শুধু দেশ নয় ,সমগ্র মানবের দুঃখ দেখে যার অন্তর আত্মা কেঁদে উঠে তিনি মহান। সুতরাং চাষী তার ক্ষেত খামারে, শ্রমিক তার কলকারখানায়, সাহিত্যিক তার সাহিত্যকর্মে ,কবিতার অপূর্ব ছন্দে, শিল্পী তার শিল্পকর্মে, গায়ক তার কন্ঠে, বাদক তার বাদ্যযন্ত্রের, বিজ্ঞানী তার আবিষ্কারের, শিক্ষকতার শিক্ষাদানে, ছাত্র তার অধ্যায়নে স্বদেশ প্রীতির পরিচয় দিতে পারে। স্বদেশপ্রেম মানুষকে বৃহত্তম ও যথোত্তর আদর্শের দিকে পরিচালিত করে। সেজন্যই কবি কণ্ঠে শুনি-

“ ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকায় মাথা

 তোমাকে বিশ্বময়ীর, বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।’’

 

প্রান্তিক যোগ্যতা

স্বর ধবনি ও ব্যঞ্জন ধবনি

Leave a Comment